প্রবাসপ্রবাসীর কলাম

শুধু ‘প্রবাসী কার্ড’ নয়, দরকার রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মর্যাদা ও সুরক্ষা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি আজ রেমিট্যান্স। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, অর্থনীতির গতি সচল রাখা এবং লাখো পরিবারের জীবিকা টিকিয়ে রাখার পেছনে বড় অবদান রাখছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা শুধু নিজেদের পরিবার নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন। তাই প্রবাসীরা শুধু শ্রমিক নন, তাঁরা বাংলাদেশের প্রকৃত রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

সম্প্রতি রেমিট্যান্স বাড়াতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা সহজ করা, ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ তৈরি হতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই উদ্যোগ কি শুধু রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য, নাকি যাঁরা নিজেদের শ্রম, জীবন ও স্বপ্ন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন, তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্যও রাষ্ট্রের কার্যকর পরিকল্পনা রয়েছে?

বাস্তবতা হলো, অসংখ্য প্রবাসী বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হন। কেউ শ্রম শোষণের শিকার হন, কেউ বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটান, আবার কেউ মানবপাচারের ফাঁদে পড়ে নির্যাতিত হন। অনেকেই অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে দেশে ফেরেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর কিংবা মৃত্যুর পর তাঁদের পরিবার কতটুকু সহায়তা পায়, সেটি বড় প্রশ্ন।

বিমানবন্দরে বহু প্রবাসফেরত মানুষকে আমি অসহায় অবস্থায় বসে থাকতে দেখেছি। কেউ বেতন না পেয়ে ফিরেছেন, কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আবার কেউ চিকিৎসার খরচও জোগাড় করতে পারেননি। অনেকের চোখে আমি হতাশা দেখেছি; কিন্তু সেই চোখেই দেশের প্রতি একধরনের ভালোবাসাও দেখেছি। কারণ সব কষ্টের পরও তাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের পাঠানো অর্থে পরিবার বাঁচে, দেশ এগিয়ে যায়।

একজন প্রবাসী যখন বিদেশে যান, তখন শুধু একজন মানুষ বিদেশে যান না; তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আশ্রয়। বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থেকে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা যে অর্থ দেশে পাঠান, সেটিই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। অথচ সেই মানুষগুলো যখন নির্যাতনের শিকার হন বা নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরেন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ খুব কমই দেখা যায়।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, যেসব প্রবাসী দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মৃত্যুর পর পরিবারগুলো প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনা চালাতে পারে না, চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারে না কিংবা ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তাও পায় না। অথচ এই পরিবারগুলোর ত্যাগের ওপরই অনেক ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

আমি মনে করি, প্রবাসীরা অনেকটা মোমবাতির মতো—নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেন। কিন্তু যখন সেই মোমবাতি নিভে যায়, তখন অনেকেই আর তার অস্তিত্ব খোঁজেন না। এই বাস্তবতা বদলানো প্রয়োজন। কারণ একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে ত্যাগী মানুষদের শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না।

সময় এসেছে প্রবাসীদের শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে না দেখে দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করার। সত্যিকার অর্থে তাঁদের সম্মান জানাতে হলে একটি সমন্বিত সুরক্ষা ও স্বীকৃতি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রবাসফেরত শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রবাসী নির্যাতন, দুর্ঘটনা বা মানবপাচারের শিকার হয়ে দেশে ফেরেন, তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

এর পাশাপাশি নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পরিবারের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাঁদের সন্তানদের শিক্ষাসহায়তা, চিকিৎসাসুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিমানবন্দর, সরকারি অফিস ও বিভিন্ন সেবাখাতে প্রবাসীদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেমিট্যান্স শুধু অর্থ নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজারো কান্না, ত্যাগ, বিচ্ছেদ ও সংগ্রামের গল্প। তাই শুধু ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন এমন একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে প্রবাসী ও তাঁদের পরিবার নিজেদের নিরাপদ, সম্মানিত ও মূল্যবান মনে করতে পারেন।

আসুন, আমরা শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ না গুনি; সেই মানুষগুলোর কথাও ভাবি, যাঁদের ত্যাগে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করা।

লেখা: আল আমিন নয়ন | অভিবাসী কর্মী ও সভাপতি, অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button